দ্বাদশ সংশোধনী সম্পর্কে লিখ

 

বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী: সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম

বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে দ্বাদশ সংশোধনী (12th Amendment) হলো অন্যতম ইতিবাচক এবং মাইলফলক একটি পরিবর্তন। ১৯৯১ সালে পাস হওয়া এই সংশোধনীর মাধ্যমে দীর্ঘ ১৬ বছর পর দেশে পুনরায় সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা (Parliamentary Form of Government) ফিরিয়ে আনা হয় এবং রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থার অবসান ঘটে।


১. পটভূমি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

১৯৭৫ সালে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত একদলীয় শাসন ব্যবস্থা (বাকশাল) প্রবর্তন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় সামরিক ও আধা-সামরিক শাসনামলেও রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সব ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতেই কেন্দ্রীভূত থাকে।

১৯৯০ সালে ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের মুখে সামরিক শাসক জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতন ঘটে। এরপর ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে জয়লাভ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠন করে এবং প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আসে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ক্ষমতা হস্তান্তরের পর দেশের শাসন পদ্ধতি কেমন হবে, তা নিয়ে দুই প্রধান দলই সংসদীয় ব্যবস্থার পক্ষে একমত হয়।


২. বিল পাস ও কার্যকর হওয়া

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার এবং বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলের যৌথ উদ্যোগে এবং সর্বসম্মতিক্রমে সংসদে বিলটি আনা হয়। ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এটি পাস হয়।

যেহেতু এটি একটি মৌলিক পরিবর্তন ছিল, তাই সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর দেশজুড়ে একটি ঐতিহাসিক 'গণভোট' (Referendum) অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটে দেশের সিংহভাগ মানুষ সংসদীয় ব্যবস্থার পক্ষে রায় দিলে ১৯ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতির সম্মতিক্রমে দ্বাদশ সংশোধনী চূড়ান্তভাবে আইন হিসেবে কার্যকর হয়।


৩. মূল বিষয়বস্তু ও প্রধান পরিবর্তনসমূহ

দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের মূল কাঠামোতে বেশ কিছু যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা হয়:

  • সংসদীয় ব্যবস্থার প্রবর্তন: রাষ্ট্রপতির পরিবর্তেCabinet বা মন্ত্রিসভাকে দেশের মূল নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু করা হয়। সরকারের সকল কাজের জন্য প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রিসভাকে সংসদের কাছে জবাবদিহি করার নিয়ম চালু হয়।
  • প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা বৃদ্ধি: প্রধানমন্ত্রী হন সরকারের প্রকৃত প্রধান (Chief Executive)। রাষ্ট্রপতির নামে দেশের শাসনকার্য পরিচালিত হলেও, কার্যত রাষ্ট্রপতি কেবল প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতির নিয়োগ ছাড়া অন্য সব কাজ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী করতে বাধ্য থাকেন।
  • রাষ্ট্রপতির পদমর্যাদা: রাষ্ট্রপতিকে রাষ্ট্রের প্রধান (Head of State) হিসেবে অলঙ্কারিক পদমর্যাদা দেওয়া হয়। এছাড়া রাষ্ট্রপতি আর জনগণের সরাসরি ভোটে নয়, বরং জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার বিধান করা হয়।
  • উপ-রাষ্ট্রপতি পদ বিলোপ: সংবিধানে থাকা উপ-রাষ্ট্রপতি (Vice-President) পদটি পুরোপুরি বিলুপ্ত করা হয়। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে স্পিকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন বলে নিয়ম করা হয়।
  • দল পরিবর্তন বা ফ্লোর ক্রসিং রোধ (অনুচ্ছেদ ৭০): সংসদীয় ব্যবস্থায় সরকারের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে ৭০ অনুচ্ছেদকে আরও শক্তিশালী করা হয়। কোনো সংসদ সদস্য নিজ দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে বা দল থেকে পদত্যাগ করলে তার আসন শূন্য হওয়ার বিধান কঠোর করা হয়।

৪. এই সংশোধনীর গুরুত্ব ও মূল্যায়ন

দ্বাদশ সংশোধনীকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ 'রাজনৈতিক সমঝোতা' হিসেবে দেখা হয়। এর প্রধান গুরুত্বগুলো হলো:

গণতান্ত্রিক ঐকমত্য: তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকা সত্ত্বেও দেশ ও গণতন্ত্রের স্বার্থে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি এক টেবিলে বসে এই সংশোধনী পাস করেছিল, যা দেশের ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত।
  • স্বৈরাচারী ব্যবস্থার অবসান: একজন মাত্র ব্যক্তির হাতে (রাষ্ট্রপতি) সমস্ত ক্ষমতা কুক্ষিগত থাকার যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, এই সংশোধনীর মাধ্যমে তা ভেঙে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা হয়।
  • সংসদের সার্বভৌমত্ব: জাতীয় সংসদকে দেশের সকল রাজনৈতিক ও আইনি সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা হয়।

৫. উপসংহার

যদিও পরবর্তীতে ৭০ অনুচ্ছেদের কঠোরতার কারণে সংসদ সদস্যদের নিজস্ব মত প্রকাশের স্বাধীনতা বা সংসদীয় একনায়কত্ব নিয়ে কিছু বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তবুও দ্বাদশ সংশোধনী বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্র চর্চা এবং জবাবদিহিতামূলক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে মজবুত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল। ১৯৯১ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে এই সংসদীয় পদ্ধতির শাসন ব্যবস্থাপনাই চলমান রয়েছে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url