নাকবা কি?

 
ছবি: নাকবা চাবি (সংগৃহীত)

নাকবা কি? 

‎নাকবার সূচনা:

‎•১৯৪৮ সালের ১৫ মে। ফিলিস্তিনের ইতিহাসে এ দিনটি কেবল একটি তারিখ নয়, বরং একটি জাতির মানচিত্র ছিন্নভিন্ন করার দিন। আজ সেই ‘নাকবা’ বা মহাবিপর্যয়ের ৭৮ বছর পূর্ণ হলো। দীর্ঘ আট দশক পেরিয়ে গেলেও ফিলিস্তিনিদের হৃদয়ে সেই ঘরবাড়ি হারানোর ক্ষত আজও সতেজ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা বয়ে বেড়াচ্ছেন সেই চাবি, যা তাদের হারানো ভিটেমাটির শেষ স্মৃতি এবং প্রত্যাশার প্রতীক। 
ছবি: নাকবার পর থেকে ফিলিস্তিনের দখলকৃত ভূমির বর্তমান দৃশ্যপট 

‎নাকবা কি?
‎‘নাকবা’ (Nakba) একটি আরবি শব্দ, যার আভিধানিক অর্থ হলো ‘মহাবিপর্যয়’ বা ‘বিপর্যয়কর ঘটনা’। ফিলিস্তিনিদের এই উচ্ছেদ ও ধ্বংসযজ্ঞকে কেন এবং কীভাবে এই নামে অভিহিত করা শুরু হলো, তার পেছনে রয়েছে গভীর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের আগে এবং যুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনিরা যখন বাস্তুচ্যুত হচ্ছিল, তখন এই শব্দটির ব্যবহার ছিল সীমিত। তবে ১৯৪৮ সালের আগস্ট মাসে বিশিষ্ট সিরীয় ইতিহাসবিদ ও বুদ্ধিজীবী কনস্টানটাইন জুরেইক (Constantine Zureiq) তাঁর বিখ্যাত বই ‘মা’না আন-নাকবা’ (The Meaning of the Nakba) প্রকাশ করেন। তিনি এই বইতে ১৯৪৮ সালে আরবদের পরাজয় এবং ফিলিস্তিনিদের দেশান্তরী হওয়ার ঘটনাকে একটি ‘জাতীয় বিপর্যয়’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে প্রথম ‘নাকবা’ শব্দটি ব্যবহার করেন। তাঁর মতে, এটি কেবল একটি রাজনৈতিক বা সামরিক পরাজয় ছিল না, এটি ছিল আরব সমাজের একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক বিপর্যয়। পরবর্তী সময়ে ফিলিস্তিনি জননেতা ও ইতিহাসবিদরা একে তাদের জাতীয় শোক ও প্রতিরোধের কেন্দ্রীয় শব্দ হিসেবে গ্রহণ করেন। ১৯৭০-এর দশকের পর থেকে এটি একটি বিশ্বজনীন শব্দে পরিণত হয়, যা ১৯৪৮ সালের সেই পরিকল্পিত জাতিগত উচ্ছেদকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরে।
‎•
১৯৪৮ সালের সেই উত্তাল দিনগুলোতে তৎকালীন ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের প্রায় ৭৮ শতাংশ দখল করে ইসরায়েল রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়েছিল। এর ফলে অন্তত ৭ লাখ ৫০ হাজার ফিলিস্তিনি তাদের পৈত্তিক নিবাস থেকে বিতাড়িত হন। প্রায় ৫০০-এর বেশি গ্রাম ও শহর মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফিলিস্তিনিদের জন্য এটি ছিল এমন এক আঘাত, যা আজও তাদের জাতীয় জীবনের প্রতিটি স্তরে অনুভূত হয়। প্রতি বছর ১৫ মে যখন বিশ্বজুড়ে ফিলিস্তিনিরা এই দিনটি পালন করেন, তখন তারা মূলত সেই সূচনালগ্নকে স্মরণ করেন, যখন থেকে একটি প্রাচীন জনপদকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল।

‎নাকবার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণার পর থেকেই ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদি দখদারত্ব বিস্তারের নকশা তৈরি হতে থাকে। ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের সময় দেইর ইয়াসিনসহ বিভিন্ন এলাকায় চালানো নৃশংস হত্যাকাণ্ড ফিলিস্তিনিদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। প্রাণের ভয়ে এবং ভিটেমাটি রক্ষার লড়াইয়ে ব্যর্থ হয়ে হাজার হাজার পরিবার সামান্য কিছু সম্বল নিয়ে শরণার্থী হিসেবে বেরিয়ে পড়ে। তারা ভেবেছিলেন যুদ্ধ থামলেই কয়েক দিন পর নিজ ঘরে ফিরে আসবেন। কিন্তু সেই কয়েক দিন আজ ৭৮ বছরে ঠেকেছে। গাজা, পশ্চিম তীর এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর শরণার্থী শিবিরগুলোতে আজ ফিলিস্তিনিদের চতুর্থ বা পঞ্চম প্রজন্ম বেড়ে উঠছে, যাদের চোখে আজও ফেলে আসা যাইতুন গাছের দৃশ্য ভাসে।

‎ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামের এক অনন্য প্রতীক হলো ‘চাবি’। নাকবার সময় যারা ঘর ছেড়েছিলেন, তারা তাদের বাড়ির বড় বড় লোহার চাবিগুলো সযত্নে সঙ্গে নিয়েছিলেন। আজ সেই চাবিগুলো তাদের কাছে কেবল একটি প্রতীক নয়, বরং ‘রাইট অফ রিটার্ন’ বা নিজ ভূমিতে ফেরার আন্তর্জাতিক স্বীকৃত অধিকারের এক জীবন্ত দলিল। দাদা-দাদির হাত থেকে সেই চাবি এখন নাতি-নাতনিদের হাতে। তারা আধুনিক প্রযুক্তির যুগে বাস করলেও নিজেদের শেকড়কে ভুলে যাননি। পৃথিবীর যে প্রান্তেই তারা থাকুক না কেন, এই চাবি তাদের মনে করিয়ে দেয়, তাদের একটি বাড়ি ছিল, একটি বাগান ছিল এবং একটি স্বাধীন দেশ ছিল।

‎৭৮ বছর পর ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, ফিলিস্তিনিদের সেই বিপর্যয় বা নাকবা যেন আজও শেষ হয়নি। পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপন, জেরুজালেম থেকে উচ্ছেদ আর গাজার ওপর বছরের পর বছর চলমান অবরোধ ও হামলা—এসবই ফিলিস্তিনিদের কাছে এক ‘চলমান নাকবা’ (Ongoing Nakba)। 

‎২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাস স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের মুক্তির চিন্তাধারায় ইসরায়েলে প্রথমবারের মতো বড় অভিযান পরিচালনা করে। এতে আনুমানিক ১ হাজার ১৩৯ জন নিহত হন এবং ২০০ জনের বেশি মানুষকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়। জবাবে সেদিন থেকেই গাজায় নির্বিচার গণহত্যা ও ভূমি দখল শুরু করে ইসরায়েল।

‎হামাস–নিয়ন্ত্রিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুসারে, উপত্যকাটিতে ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৫৩ হাজার ১০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। আহত হয়েছেন ১ লাখ ১৯ হাজার ৯১৯ জন।

‎তবে গাজার সরকারি গণমাধ্যম কার্যালয়ের তথ্য বলছে, নিহতের সংখ্যা ৬১ হাজার ৭০০ ছাড়িয়ে গেছে। তারা বলেছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ থাকা হাজারো মানুষকে মৃত বলে ধরে নেওয়া হয়েছে।


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url