প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরু ও শেষ এবং কেন হয়েছিল তার প্রেক্ষাপট
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস: শুরু, শেষ এবং কেন হয়েছিল এই মহাবিনাশী যুদ্ধ?
মানব ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী এবং যুগান্তকারী অধ্যায় হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (First World War)। তৎকালীন সময়ে একে 'দ্যা গ্রেট ওয়ার' (The Great War) বা 'সব যুদ্ধ শেষ করার যুদ্ধ' বলা হতো। এই যুদ্ধ কেবল ইউরোপের মানচিত্রই বদলে দেয়নি, বরং ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল শত বছরের পুরোনো সাম্রাজ্যগুলো। নিচে এই মহাযুদ্ধের শুরু, শেষ এবং এর পেছনের মূল কারণগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কখন শুরু এবং শেষ হয়েছিল?
যুদ্ধ শুরু: ২৮ জুলাই, ১৯১৪
অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি কর্তৃক সার্বিয়ার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণার মধ্য দিয়ে ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। তবে এর ঠিক এক মাস আগে, ২৮ জুন ১৯১৪ সালে একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা এই যুদ্ধের বারুদে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল।
যুদ্ধ শেষ: ১১ নভেম্বর, ১৯১৮
দীর্ঘ ৪ বছর ৩ মাস ১১ দিন চলার পর ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর এই যুদ্ধের অবসান ঘটে। জার্মানি মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করার পর ওই দিন সকাল ১১টায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি (Armistice) স্বাক্ষরিত হয় এবং কামানের গর্জন স্তব্ধ হয়।
২. প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কেন হয়েছিল? (মূল কারণসমূহ)
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হঠাৎ করে কোনো একটি একক কারণে ঘটেনি। এর পেছনে ছিল ইউরোপীয় শক্তিগুলোর দীর্ঘদিনের পারস্পরিক ক্ষোভ, প্রতিযোগিতা এবং জটিল সব সামরিক চুক্তি। এই কারণগুলোকে সংক্ষেপে M-A-I-N সূত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়:
- M - Militarism (সামরিকবাদ): ২০ শতকের শুরুতে ইউরোপের পরাশক্তিগুলো (বিশেষ করে জার্মানি ও ব্রিটেন) নিজেদের সামরিক শক্তি ও নৌবহর বৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে। প্রত্যেকেই যুদ্ধের জন্য নিজেদের প্রস্তুত রাখছিল।
- A - Alliances (সামরিক জোট): ইউরোপের দেশগুলো গোপনে ও প্রকাশ্যে বিভিন্ন জোটে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। এর মধ্যে প্রধান দুটি জোট ছিল—
১. মিত্রশক্তি (Triple Entente): ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং রাশিয়া (পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি ও জাপান যোগ দেয়)।
২. অক্ষশক্তি বা কেন্দ্রীয় শক্তি (Triple Alliance): জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি এবং ইতালি (যুদ্ধ শুরুর পর অটোমান সাম্রাজ্য বা উসমানীয় খিলাফত ও বুলগেরিয়া এতে যোগ দেয়)।
এই জোটগুলোর নিয়ম ছিল, কোনো এক সদস্য আক্রান্ত হলে বাকিরা তার পক্ষে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে। - I - Imperialism (সাম্রাজ্যবাদ): আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল দখল করে নিজেদের উপনিবেশ বা কলোনি বাড়ানোর জন্য ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং নতুন শক্তি হিসেবে উদীয়মান জার্মানির মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছিল।
- N - Nationalism (উগ্র জাতীয়তাবাদ): ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে 'নিজের জাতি শ্রেষ্ঠ' এই উগ্র মানসিকতা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে বলকান অঞ্চলে (যেমন সার্বিয়া) স্লাভ জাতির মানুষেরা অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের কবল থেকে মুক্ত হতে চাচ্ছিল।
তাত্ক্ষণিক কারণ: আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ হত্যাকাণ্ড
১৯১৪ সালের ২৮ জুন অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সিংহাসনের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ এবং তাঁর স্ত্রী সোফি বসনিয়ার সারাজেভো শহরে সফরে যান। সেখানে গাভরিলো প্রিন্সিপ নামের এক সার্বিয়ান উগ্র জাতীয়তাবাদী তরুণ তাঁদের গুলি করে হত্যা করে।
অস্ট্রিয়া এই হত্যাকাণ্ডের জন্য সরাসরি সার্বিয়াকে দায়ী করে এবং এক কঠোর আলটিমেটাম দেয়। সার্বিয়া তা পুরোপুরি মেনে না নেওয়ায়, ঠিক এক মাস পর ২৮ জুলাই সার্বিয়ার ওপর আক্রমণ করে অস্ট্রিয়া। এরপর চেইন রিঅ্যাকশনের মতো রাশিয়ার সমর্থনে সার্বিয়া, জার্মানির সমর্থনে অস্ট্রিয়া এবং ফ্রান্স-ব্রিটেন রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে এটি বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয়।
৩. যুদ্ধের ফলাফল ও ঐতিহাসিক চুক্তি
এই যুদ্ধে মিত্রশক্তি (ইউএসএ, ব্রিটেন, ফ্রান্স) চূড়ান্ত বিজয় লাভ করে এবং অক্ষশক্তি বা কেন্দ্রীয় শক্তির শোচনীয় পরাজয় ঘটে। যুদ্ধের ফল ছিল ভয়াবহ:
- সাম্রাজ্যের পতন: এই যুদ্ধের ফলে বিশ্বের ৪টি বড় বড় পরাক্রমশালী সাম্রাজ্যের পতন ঘটে—জার্মান সাম্রাজ্য, অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্য, রুশ সাম্রাজ্য এবং উসমানীয় বা অটোমান সাম্রাজ্য।
- ভার্সাই চুক্তি (১৯১৯): যুদ্ধের পর ১৯১৯ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে 'ভার্সাই চুক্তি' স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিতে জার্মানিকে যুদ্ধের জন্য এককভাবে দায়ী করা হয় এবং তাদের ওপর বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ ও সামরিক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়া হয়। এই অসম্মানজনক চুক্তিই পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজ বপন করেছিল।
- লীগ অব নেশনস প্রতিষ্ঠা: ভবিষ্যতে যেন এমন বড় যুদ্ধ আর না হয়, সেজন্য বিশ্ব শান্তি বজায় রাখতে প্রথম আন্তর্জাতিক সংস্থা 'লীগ অব নেশনস' (জাতিসংঘের পূর্বসূরী) গঠিত হয়।
এক নজরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলি
| যুদ্ধ শুরুর তারিখ | ২৮ জুলাই, ১৯১৪ |
| যুদ্ধ শেষের তারিখ | ১১ নভেম্বর, ১৯১৮ |
| তাত্ক্ষণিক কারণ | অস্ট্রিয়ার যুবরাজ ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ হত্যাকাণ্ড (২৮ জুন, ১৯১৪) |
| আমেরিকার যোগদান | ১৯১৭ সালে (লুসিটানিয়া নামক জাহাজ জার্মানি কর্তৃক ডুবিয়ে দেওয়ার পর) |
| শান্তি চুক্তি | ভার্সাই চুক্তি (২৮ জুন, ১৯১৯) |
| মোট ক্ষয়ক্ষতি | প্রায় ২ কোটি মানুষ নিহত এবং ২.১ কোটি মানুষ আহত হয়। |
উপসংহার:
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছিল আধুনিক প্রযুক্তির (যেমন- ট্যাংক, মেশিনগান, বিষাক্ত গ্যাস এবং যুদ্ধবিমান) ব্যবহারে লড়া প্রথম মহাযুদ্ধ, যা মানবসভ্যতার ইতিহাসে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল। বিসিএস এবং অন্যান্য সাধারণ জ্ঞান পরীক্ষার জন্য এই যুদ্ধের কারণ, প্রধান প্রধান জোট এবং ভার্সাই চুক্তি সম্পর্কিত তথ্যগুলো জানা অত্যন্ত জরুরি।
