১৯৫২ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাস
১৯৫২ থেকে ১৯৭১: বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের রক্তাক্ত ইতিহাস
১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও কেবল ধর্মের দোহাই দিয়ে পূর্ব বাংলা তথা বর্তমান বাংলাদেশকে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের অংশ করা হয়। তবে শুরু থেকেই পূর্ব বাংলার মানুষের ওপর নেমে আসে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক বৈষম্য। এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যে গড়ে ওঠে বাঙালির স্বাধীনতার মূল ভিত্তি।
১. ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলন: স্বাধিকারের প্রথম বীজ
পাকিস্তান সৃষ্টির পর পরই উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্র শুরু হয়। এর প্রতিবাদে গর্জে ওঠে পূর্ব বাংলার ছাত্র-জনতা। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি (৮ই ফাল্গুন ১৩৫৮) রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে মিছিল বের করা হয়।
পুলিশের নির্বিচার গুলিতে রফিক, শফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ নাম না জানা অনেকেই শহীদ হন। রক্তক্ষয়ী এই আন্দোলনের মুখে পাকিস্তান সরকার বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। ভাষা আন্দোলন বাঙালির মনে জাতীয়তাবাদের জন্ম দেয়, যা পরবর্তী স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল।
২. ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন ও রাজনৈতিক উত্থান
মুসলিম লীগের একচ্ছত্র আধিপত্যের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো মিলে 'যুক্তফ্রন্ট' গঠন করে। ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে এবং শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। কিন্তু বাঙালি নেতৃত্বকে সহ্য করতে না পেরে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী মাত্র কয়েক মাসের মাথায় এই মন্ত্রিসভা ভেঙে দেয় এবং পূর্ব বাংলায় গভর্নরের শাসন জারি করে।
৩. ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন
১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক আইন জারি করে ক্ষমতা দখল করেন। ১৯৫৯ সালে গঠিত 'শরীফ শিক্ষা কমিশন' বাঙালির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ভাষাবিরোধী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে। এই গণবিরোধী শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ১৯৬২ সালে ছাত্রসমাজ তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। ১৭ই সেপ্টেম্বর পুলিশের গুলিতে বাবুল, গোলাম মোস্তফা, ওয়াজিউল্লাহসহ কয়েকজন শহীদ হন। তীব্র আন্দোলনের মুখে সরকার এই শিক্ষানীতি স্থগিত করতে বাধ্য হয়।
৪. ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ৬ দফা: বাঙালির মুক্তিসনদ
১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় পূর্ব বাংলা সম্পূর্ণ অরক্ষিত ছিল। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৬৬ সালের ৫-৬ই ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলগুলোর সম্মেলনে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব বাংলার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি পেশ করেন। এই ৬ দফা ছিল মূলত অর্থনৈতিক, প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পূর্ব বাংলার অধিকার আদায়ের রূপরেখা। দ্রুতই এটি বাঙালির "মুক্তিসনদ" হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করে।
৫. ১৯৬৮ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা
৬ দফা আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে আইয়ুব সরকার শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামি করে মোট ৩৫ জন সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করে, যা "আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা" নামে পরিচিত। অভিযোগ করা হয়েছিল যে, আসামিরা ভারতের সহায়তায় পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র করছিলেন। এই মামলার ফলে বাঙালির অসন্তোষ চরম সীমায় পৌঁছায়।
৬. ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার এবং শেখ মুজিবুর রহমানসহ রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিতে ১৯৬৯ সালে সমগ্র পূর্ব বাংলায় গণবিস্ফোরণ ঘটে। ২০শে জানুয়ারি ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান আসাদ এবং ১৫ই ফেব্রুয়ারি কারাগারে সার্জেন্ট জহুরুল হককে হত্যা করা হলে আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ১৮ই ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা শহীদ হন। গণআন্দোলনের মুখে আইয়ুব খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়া হয়। ছাত্র-জনতা রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানকে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করে।
৭. ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন
নতুন সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের অধীনে ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। নিয়মানুযায়ী আওয়ামী লীগেরই পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করার কথা ছিল।
৮. ১৯৭১: অসহযোগ আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধ
ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ১লা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করলে পূর্ব বাংলায় তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন।
"এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।"
— বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (৭ই মার্চ, ১৯৭১)
৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু জাতিকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেন। ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে ঢাকাসহ সারাদেশে ঘুমন্ত নিরপরাধ বাঙালিদের ওপর বর্বর গণহত্যা চালায়। ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে (২৫শে মার্চ দিবাগত রাত) পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
এরপর গঠিত হয় মুজিবনগর সরকার। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র যুদ্ধ, ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ এবং ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।
