পবিত্র শবে মেরাজের ঘটনার প্রেক্ষাপট কি?
পবিত্র শবে মেরাজের ঘটনার প্রেক্ষাপট
শবে মেরাজ শব্দের অর্থ কী?
মিরাজ একটি আরবি শব্দ যার অর্থ "সিঁড়ি, উঁচু করা, অথবা আরোহণ করা"। আর শবে মানে রাত, মেরাজ মানে 'ঊর্ধ্ব গমন'; শবে মেরাজ অর্থ 'ঊর্ধ্ব গমনের রাত'। ইসলাম ধর্মে শবে মেরাজের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কারণ এই মেরাজের মধ্য দিয়েই সালাত বা নামাজ মুসলমানদের জন্য ফরজ করা হয় এবং এ রাতেই প্রতিদিন ৫ বার নামাজ আদায় করার বিধান নিয়ে আসেন প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)।
শবে মেরাজ কবে সংঘটিত হয়েছিল?
মেরাজ সংঘটিত হয়েছিল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর নবুওয়াতের ১১তম বছরের ২৭ই রজবে। তখন নবীজির বয়স ৫১ বছর।
মিরাজ কেন হয়েছিল?
হিজরি নবম মাসের ২৬ তারিখ দিবাগত রাত অনুষ্ঠিত হয়েছে মেরাজ। প্রিয় নবিকে চরম বিপদের মুহূর্তে শান্ত্বনা দেয়ার নিমিত্তে এক অসাধ্য সাধন কাজের মাধ্যমে নবুয়তের সত্যতাকে সুনির্ধারিত করতে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আল্লাহ তাআলা তাঁর একান্ত সান্নিধ্যে ডেকে নেন। ইসলামের ইতিহাসে এ ঘটনা মেরাজ নামে প্রসিদ্ধ।
সহীহ হাদীসের আলোকে মিরাজুন্নবীর ঘটনা
মিরাজের ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। মুমিনের ভক্তি ও বিশ্বাস এবং আবেগ ও অনুভূতির শেকড় গভীরভাবে মিশে আছে এই ঘটনার সাথে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওহীদ ও ঈমানের দাওয়াতে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কাফেরদের নির্মম অত্যাচার ও অবর্ণনীয় বাক্যবাণে তিনি বিধ্বস্ত। মুষ্টিমেয় কিছু মুসলিম জুলুম-অত্যাচারে জর্জরিত। তবুও হৃদয়ে তারা ঈমানের আলো জ্বেলে রেখেছেন। এভাবেই এগিয়ে চলছে ইসলামের প্রচার-প্রসার। আশ্রয় ও সান্ত্বনার বিরাট দুটি বৃক্ষ একে একে চলে গেছেন। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে। খাজা আবু তালিব ও উম্মুল মুমিনীন খাদীজাতুল কুবরা (রাঃ)। আশা ছিল, তায়েফবাসী কথাগুলো মেনে নিবে এবং তাওহীদের দাওয়াত কবুল করবে। কিন্তু না, তারাও সাড়া দিল না। শুধু কি তাই, নির্দয়ভাবে ক্ষতবিক্ষত করল প্রাণের রাসূল (সাঃ) কে। এমন মুহূর্তে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ডেকে নিলেন প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে। একেবারে ঊর্ধ্বজগতে। রাতের এক খণ্ডে, জিবরাঈলকে পাঠিয়ে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই যাত্রা ছিল বুরাকে চড়ে।
জগতের ইতিহাসে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টিকারী, অলৌকিক ও বিস্ময়কর ঘটনা মিরাজ। আজ ২৬ রজব বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত পবিত্র শবে মিরাজ। মিরাজ বিশ্ব মানব সভ্যতার ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ ঘটনা। এ মিরাজ অন্য কোনো নবীর পক্ষে সম্ভব হয়নি। মিরাজ রাসুল (সা.)-এর এমন মুজিজা যাতে তিনি অনন্য।
মিরাজ আরবি শব্দ । এটি আরবি ‘উরুজুন’ শব্দ থেকে এসেছে। এর আভিধানিক অর্থ ঊর্ধ্বগমন, আরোহণ, সিঁড়ি, উত্থান, সর্বোচ্চ মর্যাদার স্থানে সমাসীন হওয়া ইত্যাদি। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়– বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাসে উপনীত হয়ে সেখান থেকে সপ্ত আকাশ ভ্রমণ করে মহান রাব্বুল আলামিনের সান্নিধ্যে উপস্থিত হওয়ার ঘটনাকে মিরাজ বলা হয়। রাসুল (সা.)-এর মক্কি জীবনের প্রায় শেষলগ্নে নবুওয়াতের দশম বছরে ৬২০ খ্রিস্টাব্দে মতান্তরে ৬২১ খ্রিস্টাব্দে রজব মাসের ২৭ তারিখ সোমবার রাতে বিশ্বের ইতিহাসে এ মহাযুগান্তকারী মিরাজের ঘটনা সংঘটিত হয়েছিলো। মিরাজের এ অলৌকিক ঘটনা কোনো কালে আর কখনো ঘটেনি।
পবিত্র কুরআনে সুরা বনি ইসরাইলে মিরাজের ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল করিমে ইরশাদ করেন– ‘পবিত্র ও মহিমান্বিত সত্ত্বা ; যিনি তাঁর বান্দাকে রাতের বেলায় মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত পরিভ্রমণ করিয়েছেন। যার চারদিকে আমি পর্যাপ্ত পরিমাণ বরকত দান করেছি। যাতে আমি তাঁকে আমার কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দেই। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।’ – (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত– ১)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এর ৫০ বছর বয়সে নবুওয়াতের দশম বর্ষে ২৭ রজব (২৬ দিবাগত) রাতে মক্কার সকলেই এমনকি পশু–পাখিরাও নিদ্রামগ্ন। আর সমগ্র জনপদ নীরব–নিথর। রাসুলুল্লাহ (সা.) ওই রাতে কাবা শরিফের চত্বরে হাতিমে অথবা কারো মতে উম্মে হানি (রা.)-এর ঘরের এক কামরায় ঘুমিয়েছিলেন। গভীর রাতে আল্লাহপাকের ফেরেশতা হজরত জিবরাঈল (আ.) ও মিকাইল (আ.) সেখানে উপস্থিত হলেন। তাঁদের সাথে ছিলো বিদ্যুতের ন্যায় বোরাক। বোরাক গাধার চেয়ে বড়, ঘোড়ার চেয়ে ছোট একটি সাধা প্রাণী এবং গতি ছিলো আলোর গতিবেগের চেয়ে অনেকগুণ বেশি।
এবার চলুন মিরাজের বিস্তারিত ঘটনার প্রেক্ষাপটের দিকে আগায়। হিজরতে মদীনার আগের কথা। বাধা আর সফলতার মাঝে এগিয়ে চলছিল ইসলামের অগ্রযাত্রা। কাফির-মুশরিকদের ঠাট্টা-বিদ্রুপ আর অকথ্য নির্যাতনে শানিত হচ্ছিল মু‘মিনের ঈমান। জ্বলে উঠছিল মুসলমানের দ্বীনের জযবা। এমনি সময়ে কোনো এক রাতে নবীজী (সাঃ) সাহাবীদের নিয়ে ইশার নামায আদায় করলেন। অতঃপর খানায়ে কাবা সংলগ্ন ‘হাতীমে’ শুয়ে বিশ্রাম নিতে লাগলেন। এই সেই ‘হাতীম’, যা এক সময়ে খানায়ে কাবারই অংশ ছিল। মক্কার কাফেররা গুরুত্বপূর্ণ কাজে এখানে সমবেত হত। পরস্পর শপথ ও মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হত। সংকটাপন্ন মুহূর্তে দুআর জন্য প্রসারিত করত দু’হাত। মক্কার সর্দারেরা এখানে প্রায় বিশ্রাম নিত। নবীজীও মাঝে মাঝে আরাম করতেন। ওই রাতেও নবীজী সেখানে তন্দ্রাবিষ্ট ছিলেন; নিদ্রা তখনও আসেনি। আর নবী-রাসূলগণের নিদ্রা তো এমনই হয়; চোখ দুটো তাঁদের মুদে আসলেও ক্বলব থাকে সর্বদা জাগ্রত। জিবরাঈল আমীন নেমে এলেন। নবীজীকে জাগ্রত করলেন। অতঃপর তাঁকে নিয়ে গেলেন আবে যমযমের নিকটে। তাঁর বক্ষের অগ্রভাগ হতে চুল পর্যন্ত বিদীর্ণ করা হল। বের করা হল তাঁর হৃৎপিণ্ড। তা আবে যমযম দ্বারা শোধন করা হল। ঈমান ও প্রজ্ঞায় ভরপুর স্বর্ণের একটি পেয়ালা এনে তা দিয়ে ভরে দেওয়া হল নবীজীর বক্ষ মুবারক। অতঃপর হৃৎপিণ্ড যথাস্থানে রেখে দিয়ে উপরিভাগ সেলাই করে দেয়া হল। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, আমি এর চিহ্ন নবীজীর বুকে প্রত্যক্ষ করেছি।
‘বুরাক’ নামক ক্ষিপ্রগতির একটি সওয়ারী আনা হল, যা ছিল গাধার চেয়ে বড় ও খচ্চরের চেয়ে ছোট এবং দীর্ঘদেহী। রং ছিল শুভ্র। এমনই ক্ষিপ্র ছিল তার চলার গতি যে, দৃষ্টিসীমার শেষ প্রান্তে গিয়ে পড়ত তার পায়ের খুর। তার পিঠের উপর জিন আঁটা ছিল, মুখে ছিল লাগাম। নবীজী রেকাবে পা রাখবেন এমন সময় ‘বুরাক’ ঔদ্ধত্য দেখাল। জিবরীল তাকে থামিয়ে বললেন, হে বুরাক! তুমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করছ? তুমি কি জান, আল্লাহর কাছে তার চেয়ে মহান ও প্রিয়তম কোনো ব্যক্তি কখনও তোমার উপর সওয়ার হয়নি। একথা শুনতেই বুরাক ঘর্মাক্ত হয়ে গেল। ১ অতঃপর নবীজী বুরাকে আরোহণ করলেন। মুহূর্তেই এসে উপস্থিত হলেন জেরুজালেম নগরীর বায়তুল মাকদিসে। জিবরীল একটি পাথর ছিদ্র করে বুরাককে বেঁধে রাখলেন।২ এটা সেই বৃত্ত, যেখানে নবীগণও নিজেদের বাহন বেঁধে রাখতেন।৩ বায়তুল মাকদিসে ঢুকে তিনি দেখেন, হযরত মূসা (আঃ) নামাযরত অবস্থায় আছেন। তিনি ছিলেন ছিপছিপে ও দীর্ঘ দেহের অধিকারী। তাঁর চুল ছিল কোঁকড়ানো, যা ছিল কান পর্যন্ত ঝুলন্ত। দেখে মনে হবে যেন ‘ শানওয়া’ গোত্রেরই একজন লোক। হযরত ঈসা (আঃ) কেও দন্ডায়মান হয়ে নামায পড়তে দেখা গেল। তিনি ছিলেন মাঝারি গড়নের, সাদা ও লাল রং বিশিষ্ট। তাঁর চুল ছিল সোজা ও চাকচিক্যময়। তাঁর আকার-আকৃতি সাহাবী উরওয়া ইবনে মাসউদ সাকাফী (রাঃ) এর সাথে অধিক মেলে। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কেও নামাযরত অবস্থায় দৃষ্টিগোচর হল। নবীজী বলেন, তাঁর দেহাবয়ব আমার সাথে অধিক সামঞ্জ্যশীল।৪
ইতিমধ্যে জামাত প্রস্তুত হল। তিনি দু’রাকাত নামায আদায় করলেন। সকল নবী-রাসূলগণ নবীজীর পিছনে ইক্তেদা করলেন। ওখান থেকে বের হয়েই দেখলেন, জিবরীল (আঃ)-এর হাতে দুটি সুদৃশ্য পাত্র। একটি শরাবের, অপরটি দুধের । পাত্রদুটি পেশ করা হলে নবীজী দুধেরটিকেই বেছে নিলেন। এতদ্দর্শনে জিবরাঈল (আঃ) তাঁকে বললেন, আপনি ও আপনার উম্মত স্বভাবজাত ফিত্রাতকেই বেছে নিয়েছেন। আপনি যদি শরাব পছন্দ করতেন, তাহলে আপনার উম্মত পথভ্রষ্ট হয়ে যেত।৫
এরপর শুরু হল ঊর্ধ্বজগতের সফর। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। রাসূল (সাঃ) বুরাকের উপরই ছিলেন। একে একে প্রতি আকাশের দ্বার তাঁর জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হল। প্রথমে দুনিয়ার দৃশ্যমান আসমানে এসে জিবরাঈল (আঃ) দ্বার উন্মুক্ত করতে অনুরোধ করেন। অপর প্রান্ত হতে প্রশ্ন হয়, কে আপনি? তিনি বললেন, আমি জিবরাঈল।
প্রশ্ন করা হয়, কে আছেন আপনার সাথে? বললেন, মুহাম্মাদ।
প্রশ্ন হয়, আপনি কি তাঁর কাছে প্রেরিত হয়েছেন? বললেন, হ্যাঁ
অতঃপর প্রথম আসমানের দ্বার খুলে দেওয়া হয়। তাঁরা এর উপরে উঠে আসেন। নবীজী (সাঃ) বলেন, ওখানে এক ব্যক্তিকে দেখতে পেলাম, যার ডানদিকে রূহের একটি ঝাঁক দেখা গেল, বামদিকেও তেমনি একটি ঝাঁক।
ওই ব্যক্তি ডানদিকে তাকালে হাসেন আর বামদিকে তাকালে কান্না করেন। তিনি আমাকে দেখে অভ্যর্থনা জানালেন এবং বললেন, মারহাবা হে মহান পুত্র! মারহাবা হে মহান নবী!
নবীজী জিবরাঈল (আঃ) কে জিজ্ঞাসা করলেন, ইনি কে? তিনি বললেন, তিনি আদম (আঃ)। তাঁর ডান ও বামদিকে যাদের দেখলেন তারা তাঁর আওলাদ। ডানদিকে যারা তারা জান্নাতী; আর বামদিকে যারা, তারা জাহান্নামী। আর তাই তিনি ডানদিকে তাকিয়ে হাসেন এবং বামদিকে তাকিয়ে কাঁদেন।৬
এরপর জিবরীল (আঃ) নবীজীকে নিয়ে দ্বিতীয় আকাশের দিকে ছুটলেন। সেখানেও দ্বার উন্মুক্ত করতে বলা হলে জিজ্ঞাসা করা হল, কে? তিনি জবাব দিলেন, জিবরাঈল। প্রশ্ন করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি উত্তর দিলেন, মুহাম্মাদ। আবার প্রশ্ন হল, তিনি কি আহূত হয়েছেন? তিনি বললেন, হাঁ, তাঁকে আনার জন্য আমি প্রেরিত হয়েছি। দরজা উন্মুক্ত করা হলে সেখানে দু’খালাত ভাই অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ) ও ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়া (আঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ হল। তাঁরা উভয়ই নবীজীকে মারহাবা বলে দুআ করলেন। এরপর জিবরাঈল তাঁকে তৃতীয় আকাশে নিয়ে গিয়ে পূর্বের মতো প্রশ্নোত্তর পর্বের পর দ্বার উন্মুক্ত হলে সেখানে হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর সাথে মুলাকাত হল। আল্লাহ তাআলা তাঁকে গোটা রূপ সৌন্দর্যের অর্ধেকটাই দান করেছিলেন। তিনিও নবীজীকে মারহাবা বলে উষ্ণ অভিবাদন জ্ঞাপন করলেন।
একই পদ্ধতিতে চতুর্থ আকাশে পৌঁছালে সেখানে হযরত ইদরীস আ.-এর সাথেও শুভেচ্ছা বিনিময় হল। নবীজী বলেন, আমরা যখন সেখান থেকে সম্মুখে অগ্রসর হচ্ছিলাম, তখন হযরত মূসা (আঃ) কান্না করতে লাগলেন। কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, এই যুবক আমার পরে প্রেরিত হয়েছে। অতঃপর তাঁর উম্মত আমার উম্মতের চেয়েও অনেক বেশি জান্নাতে যাবে। একথা ভেবেই আমি কাঁদছি। সেখান থেকে নবীজীকে ৭ম আকাশে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে তিনি হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-কে দেখলেন, তিনি বায়তুল মা‘মুরে ঠেস দিয়ে উপবিষ্ট। বায়তুল মা‘মুর সেই স্থান যেখানে প্রত্যহ এমন সত্তর হাজার ফেরেশতা ইবাদত করার জন্য প্রবেশ করে, যাদের পালা এরপর আর কখনও আসে না।
হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও নবীজীকে দেখে অভ্যর্থনা জানালেন। অতঃপর তিনি নবীজীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, মুহাম্মাদ! আপনার উম্মতকে আমার সালাম বলুন এবং তাদেরকে অবগত করুন যে, জান্নাতের মাটি পবিত্র, এর পানি সুমিষ্ট। জান্নাত হচ্ছে খুব পরিচ্ছন্ন ও সমতল। এর বৃক্ষ হচ্ছে-
سبحان الله والحمد لله ولا إله إلا الله، الله أكبر ولا حول ولا قوة إلا بالله العلى العظيم. ৭
অতঃপর নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হল। পৃথিবী থেকে যেসকল বস্তু অথবা রূহ উপরে আরোহণ করে, সেগুলো এখানে পৌঁছে থেমে যায়। তদ্রুপ ঊর্ধ্বজগৎ থেকে নিম্নে আগমনকারী সব কিছু এখানে এসে থেমে যায়। নবীজী বলেন, সিদরাতুল মুনতাহার পাতা ছিল হাতির কানের মতো, আর ফল ছিল বড় মটকার মতো। আল্লাহ তাআলার নির্দেশ যখন বৃক্ষটিকে ঘিরে নিল, তখন সে এক অপরূপ সাজে সজ্জিত হল। কোনো মানুষের সাধ্য নেই সে সৌন্দর্য বর্ণনা করার। নবীজী বলেন, সিদরাতুল মুনতাহা পেরিয়ে এত ঊর্ধ্বে পৌঁছে যাই, যেখান থেকে আমি আল্লাহর হুকুম-আহকাম লিপিবদ্ধ করার কাজে ব্যস্ত ফেরেশতাদের ‘কলমের’ আওয়াজ শুনতে পেলাম।
অতঃপর, আল্লাহ নবীজীকে যা দিবার ছিল তা দিলেন। তিনি দিনরাত্রিতে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায ফরয করলেন। ফিরে আসতে হযরত মূসা (আঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ হলে তিনি নবীজীকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার রব আপনার উম্মতের উপর কী ফরয করেছেন? নবীজী বললেন, পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায। তিনি বললেন, আপনি মহান রবের কাছে ফিরে যান এবং আরও কমিয়ে আনার আবেদন করুন। এতটুকু পালনের সাধ্য আপনার উম্মতের নেই। আমি তো বনী ইসরাঈলকে এর চেয়ে অনেক কম ফরয দিয়ে খুব পরীক্ষা করে দেখেছি। নবীজী ফের মহান রবের কাছে ফিরে গেলেন এবং বললেন, রাব্বুল আলামীন! আমার উম্মতের জন্য নামায আরও কমিয়ে দিন। আল্লাহ পাঁচ ওয়াক্ত নামায কমিয়ে দিলেন। ফিরে আসার সময় পঁয়তাল্লিশ ওয়াক্ত নামাযের কথা হযরত মূসা (আঃ)-কে জানালে তিনি বললেন, আপনার উম্মতের এতটুকু পালন করার সামর্থ্য নেই। অতএব আরও কমানোর আবেদন করুন। নবীজী বললেন, আমি এমনিভাবে বারবার আপন রব ও মূসা (আঃ)-এর কাছে আসা-যাওয়া করতে থাকলাম। আর প্রতিবারই পাঁচ-পাঁচ ওয়াক্ত করে নামায কমতে থাকল। অবশেষে আল্লাহ পাক ইরশাদ করলেন, মুহাম্মাদ! দিবা-রাত্রির মধ্যে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযই মাত্র। প্রত্যেক নামাযের জন্য দশ ওয়াক্ত নামাযের সওয়াব, ফলে সেই পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাযই হয়ে যাবে। যে ব্যক্তি সৎকাজের ইচ্ছা করবে, এরপর তা আমলে পরিণত করবে না, তার জন্যও একটি নেকী লেখা হবে। আর যে ইচ্ছা করার পর আমলেও পরিণত করবে, সে দশটি নেকী পাবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি মন্দ কর্মের কেবল ইচ্ছা করে, আমলে পরিণত করে না, তার কোনো গুনাহ লেখা হবে না। আর যদি আমলেও পরিণত করে তবে একটি মাত্র গুনাহ লিপিবদ্ধ হবে।
নবীজী বলেন, এরপর আমি নেমে এসে হযরত মূসা (আঃ) এর কাছে গেলাম। তাঁকে সবকিছু অবগত করলে তিনি বললেন, আপনার রবের কাছে গিয়ে আরও কমিয়ে আনার আবেদন করুন। আমি বললাম, মহান প্রভুর কাছে অনেকবার গিয়েছি, আবেদন করেছি। এখন আমার লজ্জা হচ্ছে। অবশেষে জান্নাত, জাহান্নাম ও সপ্তাকাশের দীর্ঘ সফর করে মহান মাওলার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য পেয়ে নবীজী ফিরে এলেন মক্কায়। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ পবিত্র রজনীতে মুসলমানদের জন্য তিনটি বিষয় হাদিয়াস্বরূপ নিয়ে এসেছিলেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামায, সূরা বাকারার শেষ আয়াতসমূহ এবং পুরো উম্মতের মধ্যে শিরক থেকে আত্মরক্ষাকারী প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য মাগফিরাত ও ক্ষমার ঘোষণা। এ ছিল উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য মিরাজের পুরস্কার।৮
এ ছিল মিরাজুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র। এর মাঝে জান্নাত ও জাহান্নামসহ বৈচিত্র্যময় সৃষ্টির অনেক কিছুই প্রত্যক্ষ করেছেন নবীজী।৯ বিভিন্ন বিক্ষিপ্ত বর্ণনায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য বিচিত্র ঘটনাবলি থেকে নির্ভরযোগ্য ঘটনা উল্লেখ করলে বিবরণ পূর্ণতা পাবে বলে মনে হয়। যেমন—
১। এ রাতে নবীজী জাহান্নাম পরিদর্শনে গেলে মালেক নামক জাহান্নামের প্রধান রক্ষী নবীজীকে সালাম ও অভ্যর্থনা জানান।১০
২। তিনি দাজ্জালকেও দেখেছিলেন।১১
৩। এমন এক দল লোকের পাশ দিয়ে নবীজী গমন করেছিলেন, যাদের নখ ছিল তামার। এই নখ দ্বারা তারা স্বীয় মুখমন্ডল ও বক্ষ আচঁড়াচ্ছিল। এদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে জিবরাঈল নবীজীকে জানালেন, এরা সেই লোক, যারা দুনিয়াতে মানুষের গোশত ভক্ষণ করত। অর্থাৎ একে অপরের গীবত ও মানহানি করত। অন্য এক বর্ণনা দ্বারা জানা যায়, বরং দুনিয়াতে গীবতকারী এসব লোকদেরকে মৃত ভক্ষণ করতে দেখেছিলেন নবীজী।১২
৪। এই মহান রাতে নবীজী এমন কিছু লোককে দেখতে পেয়েছিলেন, যাদের ঠোঁট কাঁচি দিয়ে কাটা হচ্ছিল, ঠোঁট কাটা মাত্র তা পুনরায় জোড়া লেগে পূর্ববৎ হয়ে যেত। এদের সম্পর্কে প্রশ্ন করলে জিবরাঈল নবীজীকে উত্তর দিলেন, এরা এমন বিষয়ে বক্তৃতা ও ওয়াজ করত, যা তারা নিজেরা আমল করত না।১৩
৫। শবে মেরাজে নবীজী এমন লোকদের দেখলেন, যাদের পেট ছিল এক একটি গৃহের মতো। পেটের ভেতরটা ভর্তি ছিল সাপে, যা বাইরে থেকেই দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল। প্রশ্ন করা হলে জিবরাঈল জানালেন, এরা সুদখোর।১৪
৬। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাত দেখার সৌভাগ্যও লাভ করেছিলেন।১৫
৭। মোতি জমরদের প্রাসাদে ঘেরা একটি নহর দেখতে পেলেন, যার পানি ছিল মেশক-এর চেয়ে বেশি সুগন্ধিময়। এটা কী- নবীজী জানতে চাইলে জিবরীল (আঃ) বললেন, এর নাম ‘কাওসার’, যা আপনার প্রতিপালক একমাত্র আপনার জন্যই সুরক্ষিত করে রেখেছেন।
৮। মহানবী চারটি নদীও দেখেছিলেন। এর মধ্যে দু’টি জাহেরী আর দু’টি বাতেনী। বাতেনী দু’টি জান্নাতে প্রবাহিত আর জাহেরী দু’টি হচ্ছে নীল ও ফোরাত।
৯। নবীজী জান্নাতে প্রবেশ করে একপাশে একটি হালকা আওয়াজ শুনতে পেলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এটা কিসের আওয়াজ? জিবরীল বললেন, মুয়াজ্জিন বেলালের কণ্ঠ। মিরাজ থেকে ফিরে নবীজী সাহাবায়ে কেরামের উদ্দেশে বললেন, বেলাল সাফল্য অর্জন করেছে, আমি তার জন্য এমন সব মর্তবা দেখেছি।১৬
১০। শবে মিরাজে নবীজী এক পবিত্র খোশবুর কাছ দিয়ে গেলেন। তিনি সুধালেন, এটা কীসের খোশবু? ফেরেশতারা বলল, এটা ফেরাউন-তনয়ার কেশ বিন্যাসকারিনী ও তার সন্তানদের খোশবু। কোনো একদিন চুল আচঁড়াতে গিয়ে তার হাত থেকে চিরুনী পড়ে গেলে সে বিসমিল্লাহ বলেছিল। ফেরাউন-তনয়া বলল আমার পিতা? মহিলা বলল, আমার রব তিনি, যিনি আপনার ও আপনার পিতার প্রতিপালক। ফেরাউন-তনয়া বলল, আমার পিতা ছাড়া কি তোমার অন্য কোনো রবও আছে? মহিলা বলল, হাঁ। এ খবর ফেরাউনের কানে গেলে সে মহিলাকে ডেকে বলল, আমি ছাড়া তোমার আরও রব আছে? সে বলল, হাঁ, আমার ও আপনার প্রতিপালক তো মহান আল্লাহ তাআলা। শুনে অগ্নিশর্মা হয়ে ফিরাউন তামায় নির্মিত একটি বড় পাত্রে তেল ভরে খুব গরম করার আদেশ দিল। ওই মহিলা ও তার সন্তানদের এতে নিক্ষেপের হুকুম হল। ফিরাউনের লোকেরা এক এক করে সবাইকে তাতে নিক্ষেপ করতে লাগল। সবার শেষে মায়ের কোলে থাকা নিষ্পাপ শিশুটির পালা এল। ছোট্ট শিশু মুখ ফুটে মাকে অভয় দিল। বলে উঠল, মা নেমে পড়ো, পিছপা হয়ো না। আখিরাতের আজাবের তুলনায় দুনিয়ার আজাব তো অতি তুচ্ছ।১৭
১১। বিভিন্ন বর্ণনা দ্বারা জানা যায়, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বায়তুল মাকদিসে যাওয়া বা আসার পথে মক্কার কুরাইশদের বাণিজ্য কাফেলাও দেখতে পেয়েছিলেন।১৮
শবে মিরাজের সকাল বেলা। নবীজী হাতীমে কাবায় চিন্তিত মন নিয়ে একান্তে বসে আছেন। মনে মনে ভাবছেন, রাত্রে সংঘটিত মিরাজ ও ইসরার কথা প্রকাশ করলে মানুষ আমাকে মিথ্যুক বলবে না তো? ইতিমধ্যে কাছ দিয়ে যাচ্ছিল আবু জাহেল। নবীজীর কাছে বসে বিদ্রুপের ছলে বলল, কোনো ব্যাপার আছে নাকি? নবীজী বললেন, হ্যাঁ। সে বলল কী? তিনি জবাব দিলেন, আজ রাতে আমার মিরাজ হয়েছে। সে বিস্ময়ের সাথে সুধাল, কতদূর পর্যন্ত যাওয়া হয়েছিল? নবীজী বললেন, বায়তুল মাকদিস পর্যন্ত। সে আরও ঠাট্টা করে বলে উঠল, চমৎকার তো! এরপর সকালেই তুমি আমাদের কাছে এসে গেলে? তিনি দৃঢ়তার সাথে বললেন, হ্যাঁ। এরপর আবু জাহেল কথা না বাড়িয়ে তাঁকে বলল, আচ্ছা! আমি যদি পুরো কওমকে ডেকে নিয়ে আসি তাহলেও কি তুমি একই কথা বলতে পারবে? নবীজী আরও সুদৃঢ় হয়ে বললেন, অবশ্যই। আবু জাহল লুয়াই ইবনে কা‘ব গোত্রের নাম ধরে ডাকতে লাগল। আর তারাও দলে দলে খানায়ে কাবায় সমবেত হতে লাগল। সকলে এসে উপস্থিত হলে আবু জাহল বলল, আমাকে যা কিছু তুমি শুনিয়েছিলে, পারলে তা এদের কাছেও ব্যক্ত করো। নবীজী পুনরায় একই ঘটনা তাদের সম্মুখে ব্যক্ত করলে কিছু লোক বিস্ময়ে হাতের উপর হাত রাখল। আবার অনেকেই হতবাক হয়ে মাথায় হাত দিল। তারা বলল, তাহলে তুমি কি আমাদের কাছে বায়তুল মাকদিসের অবস্থা বর্ণনা করতে পারবে? উল্লেখ্য, উপস্থিত অনেকেই বায়তুল মাকদিস সম্পর্কে সম্যক অবগত ছিল।১৯
নবীজী বলেন, আমি তাদের কাছে বায়তুল মাকদিসের অবস্থা বর্ণনা করতে লাগলাম। কিছু বিষয় আমার কাছে অস্পষ্ট মনে হচ্ছিল। মনে মনে আমি খুব চিন্তিত হচ্ছিলাম। আমি তখনও কাবার হাতীমে পুরো কওমের সামনে দন্ডায়মান, ইতিমধ্যেই পুরো বায়তুল মাকদিস আমার চোখের সামনে উদ্ভাসিত করা হল। আকীলের ঘরের উপর উদ্ভাসিত বায়তুল মাকদিস আমি স্বচক্ষে দেখে দেখে সব কিছু নিঃসংকোচে বলতে লাগলাম। শুনে উপস্থিত লোকেরা মন্তব্য করল, মানচিত্র ও অবস্থা তো সঠিকই বর্ণিত হয়েছে।
মক্কার কোনো পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছিলেন হযরত আবু বকর (রাঃ)। মক্কার কাফেররা তাকে এ বিস্ময়ের কথা বলে সুধাল, তবুও কি তুমি তাকে বিশ্বাস করবে? হযরত আবু বকরের হৃদয়ে ঈমানের বহ্নিশিখা জ্বলে উঠল। তিনি এক আকাশ আস্থা নিয়ে সুদৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠলেন, আমি তো এর চেয়েও আরো দূরের অনেক জটিল বিষয়েও তাঁকে বিশ্বাস করি। তাঁর কাছে আসা আসমানী বার্তাসমূহের উপর রয়েছে আমার অটল বিশ্বাস ও সুদৃঢ় ঈমান। অতএব...২০
তথ্যসূত্র : ১. তিরমিযী. হাদীস ৩১৩১, ২. প্রাগুক্ত, হাদীস ৩১৩২, ৩. মুসনাদে আহমাদ ২/৫২৮, ৪. মুসলিম, হাদীস ১৬৭, ৫. প্রাগুক্ত, হাদীস ১৬৮, ৬. বুখারী, হাদীস ৩৪৯, ৭. তিরমিযী, হাদীস ৩৪৬২, ৮. মুসলিম, হাদীস ২৭৯, ৯. আহমাদ ৫/৩৮৭, ১০. মুসলিম, হাদীস ১৬৫, ১১. প্রাগুক্ত, ১২. আহমাদ ৩/২২৪, ১৩. প্রাগুক্ত ৩/১৮১, ১৪. প্রাগুক্ত ২/৩৫৩, ১৫. তিরমিযী, হাদীস ৩১৪৭, ১৬. আহমাদ ১/২৫৭, ১৭. প্রাগুক্ত ১/৩০৯-৩১০, ১৮. মুসান্নাফ, ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ৩২৩৫৭, ১৯. তিরমিযী, হাদীস ৩৪৬২, ২০. মুসতাদরাক ২/৩৬১
