২য় বিশ্ব যুদ্ধ সম্পর্কে বিস্তারিত
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস: শুরু, শেষ, কারণ এবং মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মহাধ্বংসযজ্ঞ
মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড়, রক্তক্ষয়ী এবং পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধ হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (Second World War)। পৃথিবীর প্রায় ৩০টিরও বেশি দেশের ১০ কোটিরও বেশি সামরিক সদস্য এই যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন। এই মহাযুদ্ধে পারমাণবিক বোমার মতো বিধ্বংসী অস্ত্রের প্রথম এবং একমাত্র ব্যবহার দেখা যায়, যা বিশ্ব রাজনীতির খোলনলচে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। নিচে এই ঐতিহাসিক মহাযুদ্ধের শুরু, শেষ, কারণ এবং ফলাফল বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কখন শুরু এবং শেষ হয়েছিল?
যুদ্ধ শুরু: ১ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৯
১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর এডলফ হিটলারের নেতৃত্বাধীন নাৎসি জার্মানি কর্তৃক পোল্যান্ড আক্রমণের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। পোল্যান্ডকে রক্ষার্থে ৩ সেপ্টেম্বর ব্রিটেন ও ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে এটি বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয়।
যুদ্ধ শেষ: ২ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৫
দীর্ঘ ৬ বছর ১ দিন চলার পর ১৯৪৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর এই যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে। ১৯৪৫ সালের মে মাসে জার্মানি আত্মসমর্পণ করলেও এশিয়ায় জাপান যুদ্ধ চালিয়ে যায়। অবশেষে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা হামলার পর জাপান আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করে।
২. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কেন হয়েছিল? (মূল কারণসমূহ)
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ যেখানে হয়েছিল, ঠিক সেখান থেকেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজ রোপিত হয়েছিল। প্রধান কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- ভার্সাই চুক্তির অপমান ও জার্মানির ক্ষোভ: প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর ১৯১৯ সালের 'ভার্সাই চুক্তি'র মাধ্যমে জার্মানির ওপর চরম অপমানজনক শর্ত এবং বিশাল অঙ্কের জরিমানা চাপিয়ে দেওয়া হয়। এই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়েই জার্মানিতে হিটলারের উত্থান ঘটে।
- ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদ: ইতালিতে বেনিতো মুসোলিনির 'ফ্যাসিবাদ' এবং জার্মানিতে এডলফ হিটলারের উগ্র চরমপন্থী 'নাৎসিবাদ' (Nazism)-এর উত্থান এই যুদ্ধকে অবশম্ভাবী করে তোলে। তারা উগ্র জাতীয়তাবাদ ও সাম্রাজ্য বিস্তারের নীতি গ্রহণ করে।
- লীগ অব নেশনস-এর ব্যর্থতা: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব শান্তি বজায় রাখার জন্য 'লীগ অব নেশনস' গঠিত হলেও শক্তিশালী দেশগুলোর আগ্রাসন (যেমন- জাপানের মাঞ্চুরিয়া দখল, ইতালির ইথিওপিয়া দখল) থামাতে এটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।
- অক্ষশক্তি চুক্তি (Axis Alliance): নিজেদের শক্তি বাড়াতে ১৯৩৬-১৯৪০ সালের মধ্যে জার্মানি, ইতালি এবং জাপান মিলে একটি শক্তিশালী সামরিক জোট গড়ে তোলে, যা 'অক্ষশক্তি' নামে পরিচিত।
প্রধান দুটি সামরিক জোট
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতোই পুরো বিশ্ব প্রধানত দুটি শক্তিশালী ব্লকে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল:
১. মিত্রশক্তি (Allied Powers): প্রধান নেতৃত্বে ছিল গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স, সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া), মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (১৯৪১ সালে যোগ দেয়) এবং চীন।
২. অক্ষশক্তি (Axis Powers): প্রধান নেতৃত্বে ছিল জার্মানি, ইতালি এবং জাপান।
৩. যুদ্ধের প্রধান মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনাবলি
- পার্ল হারবার আক্রমণ (৭ ডিসেম্বর, ১৯৪১): জাপান আকস্মিকভাবে আমেরিকার নৌঘাঁটি পার্ল হারবারে হামলা চালায়। এর ফলে নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি মিত্রশক্তির পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেয়।
- অপারেশন বারবারোসা (জুন, ১৯৪১): হিটলারের নির্দেশে জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে। এটি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান। তবে স্টালিনগ্রাদের যুদ্ধে জার্মানির শোচনীয় পরাজয় ঘটে, যা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
- ডি-ডে (D-Day: ৬ জুন, ১৯৪৪): মিত্রবাহিনী ফ্রান্সের নরম্যান্ডি উপকূলে ইতিহাসের সর্ববৃহৎ উভচর অভিযান চালিয়ে জার্মানির দখল থেকে ইউরোপকে মুক্ত করতে শুরু করে।
৪. যুদ্ধের ভয়াবহ সমাপ্তি ও ফলাফল
১৯৪৫ সালের ৩০ এপ্রিল বার্লিনে নিজের বাঙ্কারে এডলফ হিটলার আত্মহত্যা করেন। মে মাসে জার্মানি বিনাশর্তে আত্মসমর্পণ করে। তবে এশিয়ায় যুদ্ধ শেষ করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতিহাসের প্রথম পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে।
হিরোশিমা ও নাগাসাকি (আগস্ট, ১৯৪৫): ৬ আগস্ট ১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমায় 'লিটল বয়' (Little Boy) এবং ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে 'ফ্যাট ম্যান' (Fat Man) নামের দুটি পারমাণবিক বোমা ফেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মুহূর্তের মধ্যে লাখ লাখ মানুষ ছাই হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে ১৫ আগস্ট জাপান আত্মসমর্পণের ঘোষণা দেয় এবং ২ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ শেষ হয়।
সুদূরপ্রসারী ফলাফল:
- জাতিসংঘ (UN) প্রতিষ্ঠা: লীগ অব নেশনস-এর ব্যর্থতার পর বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর 'জাতিসংঘ' গঠিত হয়।
- হলোকাস্ট (Holocaust): হিটলারের নাৎসি বাহিনী দ্বারা প্রায় ৬০ লাখ ইহুদিকে নির্মমভাবে হত্যা করার ঘটনা উন্মোচিত হয়, যা মানব ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্টতম গণহত্যা।
- কোল্ড ওয়ার বা স্নায়ুযুদ্ধ: ব্রিটেন ও ফ্রান্সের ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং বিশ্বে দুটি নতুন পরাশক্তির জন্ম হয়—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (পুঁজিবাদী) এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন (সমাজতান্ত্রিক)। এই দুই ব্লকের মধ্যে শুরু হয় দীর্ঘস্থায়ী 'স্নায়ুযুদ্ধ'।
এক নজরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলি (BCS GK)
| যুদ্ধ শুরুর কারণ | জার্মানি কর্তৃক পোল্যান্ড আক্রমণ (১ সেপ্টেম্বর, ১৯Snapshot) |
| পার্ল হারবার আক্রমণ | ৭ ডিসেম্বর, ১৯৪১ (জাপান কর্তৃক আমেরিকার ঘাঁটিতে হামলা) |
| হিরোশিমায় বোমা হামলা | ৬ আগস্ট, ১৯৪৫ (বোমার নাম: লিটল বয়, বিমান: এনোলা গে) |
| নাগাসাকিতে বোমা হামলা | ৯ আগস্ট, ১৯৪৫ (বোমার নাম: ফ্যাট ম্যান) |
| আনুষ্ঠানিক অবসান | ২ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৫ (জাপানের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে) |
| মোট ক্ষয়ক্ষতি | আনুমানিক ৭ থেকে ৮.৫ কোটি মানুষ প্রাণ হারান (যার সিংহভাগই ছিল বেসামরিক নাগরিক)। |
উপসংহার:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মানবজাতিকে শিখিয়েছে যুদ্ধের ভয়াবহতা কতটা সুদূরপ্রসারী হতে পারে। বিসিএস প্রিলিমিনারি এবং অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার আন্তর্জাতিক অংশ থেকে পারমাণবিক বোমার নাম, তারিখ, বিভিন্ন অপারেশন (যেমন- অপারেশন বারবারোসা) এবং আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো থেকে প্রায়ই প্রশ্ন আসে। আশা করি এই পোস্টটি আপনার পরীক্ষার প্রস্তুতিকে আরও সহজ করবে।
