একাদশ সংশোধনী সম্পর্কে লিখ
বাংলাদেশের সংবিধানের একাদশ সংশোধনী: একটি ক্রান্তিকালীন আইনি সমাধান
বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে একাদশ সংশোধনী (11th Amendment) হলো একটি বিশেষ ক্রান্তিকালীন বা অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা। ১৯৯১ সালে পাস হওয়া এই সংশোধনীর মূল উদ্দেশ্য ছিল স্বৈরাচার পতন পরবর্তী প্রথম অরাজনৈতিক প্রধান উপদেষ্টা (তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি) বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি পদে ফিরে যাওয়ার আইনি বৈধতা নিশ্চিত করা।
১. পটভূমি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১৯৯০ সালের শেষভাগে তীব্র গণ-আন্দোলনের মুখে তৎকালীন সামরিক শাসক জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ক্ষমতার শূন্যতা ও রাজনৈতিক অচলাবস্থা দূর করতে তৎকালীন তিন দলীয় জোটের রূপরেখা অনুযায়ী একটি নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।
সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৎকালীন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে উপ-রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেওয়া হয় এবং এরপর রাষ্ট্রপতি এরশাদ পদত্যাগ করলে তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার প্রধান শর্তই ছিল—একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন করার পর তিনি পুনরায় তার মূল পদ অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি পদে ফিরে যাবেন।
তার অধীনে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অত্যন্ত সুষ্ঠু ও সফলভাবে সম্পন্ন হয়। নির্বাচনে জয়লাভ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠন করে।
২. আইনি জটিলতা ও সংশোধনীর প্রয়োজনীয়তা
নির্বাচন শেষে যখন নতুন সরকার গঠন এবং নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় আসে, তখন একটি বড় আইনি জটিলতা দেখা দেয়। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদে (যেমন রাষ্ট্রপতির পদ) অধিষ্ঠিত থাকার পর কোনো ব্যক্তির পুনরায় পূর্বের কোনো পদে (যেমন প্রধান বিচারপতি) ফিরে যাওয়ার সরাসরি কোনো বিধান ছিল না।
জটিলতার মূল কারণ: বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ যেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন শেষে কোনো আইনি বাধা ছাড়াই প্রধান বিচারপতি পদে ফিরে যেতে পারেন এবং তার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেওয়া সকল সিদ্ধান্ত ও অধ্যাদেশের যেন একটি স্থায়ী সাংবিধানিক বৈধতা থাকে, সেজন্যই এই সংশোধনীর প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল।
৩. বিল পাস ও মূল বিষয়বস্তু
আইনি এই সংকট দূর করতে ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট পঞ্চম জাতীয় সংসদে একাদশ সংশোধনী বিলটি উত্থাপন ও পাস করা হয়। এরপর ১০ আগস্ট এতে রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ হয়। এই সংশোধনীর মূল বিষয়গুলো ছিল নিম্নরূপ:
- পূর্বের পদে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ: সংবিধানে অস্থায়ী বিধানাবলী সম্পর্কিত
তফসিল ৪-এর অধীনে একটি নতুন ধারা যুক্ত করে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি পদে পুনরায় যোগদানের বিষয়টি সম্পূর্ণ বৈধ ঘোষণা করা হয়। - অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির কাজের বৈধতা: ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর থেকে ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের জারিকৃত সকল অধ্যাদেশ, আইন, ঘোষণা এবং গৃহীত সকল পদক্ষেপকে অনুমোদন ও সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়া হয়।
- দায়মুক্তি প্রদান: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সমস্ত কর্মকাণ্ডকে আদালতের এখতিয়ারের বাইরে রেখে সুরক্ষাকবচ দেওয়া হয়, যাতে পরবর্তীতে এগুলো নিয়ে কোনো আইনি প্রশ্ন বা মামলা না তোলা যায়।
৪. গুরুত্ব ও মূল্যায়ন
একাদশ সংশোধনীটি কোনো দীর্ঘমেয়াদী নীতি পরিবর্তনের জন্য করা হয়নি, বরং এটি ছিল একটি বিশেষ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে নেওয়া "ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট" বা সংকটকালীন আইনি সমাধান। এর প্রধান গুরুত্বগুলো হলো:
- প্রতিশ্রুতি রক্ষা: রাজনৈতিক দলগুলো বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে দেওয়া তাদের পূর্ব প্রতিশ্রুতি এই সংশোধনীর মাধ্যমে পূরণ করে, যা দেশের রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত ছিল।
- গণতান্ত্রিক উত্তরণ: দীর্ঘ সামরিক শাসনের পর একটি সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক ও বেসামরিক সরকার গঠনে যে অন্তর্বর্তীকালীন আইনি শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা এই সংশোধনীর মাধ্যমে সাফল্যের সাথে পূরণ করা হয়।
- বিচার বিভাগের মর্যাদা রক্ষা: একজন যোগ্য এবং নিরপেক্ষ বিচারককে তার প্রাপ্য সম্মানের সাথে মূল পদে ফিরিয়ে এনে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মর্যাদাকে সমুন্নত রাখা হয়।
৫. উপসংহার
বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ তার দায়িত্ব শেষে ১৯৯১ সালের ১০ অক্টোবর পুনরায় প্রধান বিচারপতি হিসেবে বিচার বিভাগে ফিরে যান এবং ১৯৯৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অবসরে যান (পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে তিনি আবার দলমত নির্বিশেষে দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন)। বাংলাদেশের ইতিহাসে একাদশ সংশোধনীটি একটি সফল ও শান্তিপূর্ণ স্বৈরাচার-উত্তর গণতান্ত্রিক রূপান্তরের আইনি দলিল হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।