দশম সংশোধনী সম্পর্কে লিখ
বাংলাদেশের সংবিধানের দশম সংশোধনী: সংরক্ষিত নারী আসনের মেয়াদ বৃদ্ধি
বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে দশম সংশোধনী (10th Amendment) হলো জাতীয় সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১৯৯০ সালে পাস হওয়া এই সংশোধনীর মূল ফোকাস ছিল জাতীয় সংসদে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসনের মেয়াদ আরও বৃদ্ধি করা।
১. পটভূমি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে বাংলাদেশের অনগ্রসর ও দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করতে জাতীয় সংসদে ১৫টি আসন সংরক্ষিত রাখার বিধান করা হয়েছিল, যার মেয়াদ ছিল ১০ বছর। পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে এই সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা ১৫ থেকে বাড়িয়ে ৩০টি করা হয় এবং এর মেয়াদকাল আরও ১০ বছর বৃদ্ধি করা হয়।
১৯৮৯ সালের শেষের দিকে এসে ওই ১০ বছরের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এর ফলে সংসদে নারীদের জন্য আর কোনো সংরক্ষিত আসন অবশিষ্ট ছিল না। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে সংসদে নারীদের এই বিশেষ প্রতিনিধিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য পুনরায় সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
২. বিল পাস ও কার্যকর হওয়া
১৯৯০ সালের মে মাসে চতুর্থ জাতীয় সংসদে এই সংশোধনী বিলটি উত্থাপন করা হয়। ১৯৯০ সালের ১২ জুন তৎকালীন সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিলটি সংসদে পাস হয় এবং ওই বছরের ২৩ জুন রাষ্ট্রপতির সম্মতিক্রমে এটি চূড়ান্তভাবে আইনে পরিণত হয়।
৩. মূল বিষয়বস্তু ও প্রধান পরিবর্তনসমূহ
দশম সংশোধনীর পরিধি খুব বেশি বড় ছিল না, এর মূল লক্ষ্য ছিল সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদের (৩) দফায় পরিবর্তন আনা। এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
- সংরক্ষিত আসন বহাল: জাতীয় সংসদে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত ৩০টি আসন পুনর্বহাল করা হয়।
- মেয়াদকাল ১০ বছর বৃদ্ধি: সংশোধনীটি পাস হওয়ার পর থেকে পরবর্তী ১০ বছর সময়কালের জন্য এই ৩০টি সংরক্ষিত আসন সুনির্দিষ্ট করা হয়। অর্থাৎ, দশম জাতীয় সংসদের মেয়াদকাল পর্যন্ত এই সুবিধা কার্যকর রাখার সিদ্ধান্ত হয়।
- নির্বাচন পদ্ধতি: এই আসনগুলোতে নারী সংসদ সদস্যরা জনগণের সরাসরি ভোটে নয়, বরং সংসদের সাধারণ আসনে নির্বাচিত ৩০০ জন সংসদ সদস্যের ভোটের মাধ্যমে (পরোক্ষ নির্বাচন পদ্ধতিতে) নির্বাচিত হওয়ার নিয়মটিই বহাল থাকে।
৪. গুরুত্ব ও সমালোচনা
দশম সংশোধনীটি দেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক—উভয় ধরনের আলোচনারই জন্ম দিয়েছিল:
ইতিবাচক দিক: তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য এই কোটা ব্যবস্থা চালু রাখা অত্যন্ত জরুরি ছিল। এর ফলে সংসদে নারীদের কণ্ঠস্বর একেবারে হারিয়ে যায়নি।
- সমালোচনা ও আপত্তি: তৎকালীন বিরোধী দল ও নারী অধিকার কর্মীদের একাংশ এই সংশোধনীর বিরোধিতা করেছিলেন। তাদের মূল আপত্তি ছিল আসনের সংখ্যা বা মেয়াদ নিয়ে নয়, বরং নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে। তারা দাবি করেছিলেন, সংরক্ষিত আসনের নারীদের পরোক্ষ ভোটের পরিবর্তে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হওয়ার বিধান করা উচিত ছিল। পরোক্ষ পদ্ধতির কারণে সংরক্ষিত আসনের নারী এমপিরা কার্যত ক্ষমতাসীন বা সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, যা তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে কিছুটা সংকুচিত করে।
৫. দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও বর্তমান অবস্থা
এই সংশোধনীর মাধ্যমে যে ১০ বছরের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা ২০০০ সালে এসে শেষ হয়। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে আসন সংখ্যা ৪৫টি এবং ২০০৮ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তা বাড়িয়ে ৫০টি করা হয়। সর্বশেষ ২০১৮ সালের সপ্তদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই সংরক্ষিত ৫০টি আসনের মেয়াদ আরও ২৫ বছর বৃদ্ধি করা হয়েছে।
সংবিধানে নারীদের জন্য আসনের যে দীর্ঘমেয়াদী যাত্রা আজ আমরা দেখতে পাই, তার আইনি ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ১৯৯০ সালের এই দশম সংশোধনীটি একটি অন্যতম সেতু বন্ধন হিসেবে কাজ করেছিল।
