ত্রয়োদশ সংশোধনী সম্পর্কে লিখ

 

বাংলাদেশের সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী: একটি ঐতিহাসিক পর্যালোচনা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসে ত্রয়োদশ সংশোধনী (13th Amendment) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং চর্চিত অধ্যায়। ১৯৯৬ সালে পাস হওয়া এই সংশোধনীর মূল উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার জন্য একটি অস্থায়ী অরাজনৈতিক ব্যবস্থা চালু করা।


১. পটভূমি ও পাস হওয়ার প্রেক্ষাপট

১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ সালের দিকে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের অধীনে মাগুরাসহ কয়েকটি উপ-নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ ওঠে। এর পরিপ্রক্ষিতে বিরোধী দলগুলো (আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী) তৎকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে।

political অচলাবস্থা নিরসনে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি একতরফা ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ওই সংসদের প্রথম অধিবেশনেই ১৯৯৬ সালের ২৭ মার্চ ত্রয়োদশ সংশোধনী বিল পাস হয় এবং ২৮ মার্চ এটি রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করে।


২. মূল বিষয়বস্তু: তত্ত্বাধায়ক সরকার ব্যবস্থা

এই সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধানে অনুচ্ছেদ ৫৮(খ) থেকে ৫৮(ঙ) অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যার মূল বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল নিম্নরূপ:

  • অরাজনৈতিক সরকার: সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য একটি নির্দলীয় ও অরাজনৈতিক 'তত্ত্বাবধায়ক সরকার' গঠিত হবে।
  • প্রধান উপদেষ্টা: সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হবেন এই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। তিনি যদি রাজি না হন বা তাকে না পাওয়া যায়, তবে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য যোগ্য ব্যক্তিদের (যেমন: আপিল বিভাগের সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত বিচারক বা নাগরিকদের মধ্য থেকে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি) মধ্য থেকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের বিধান রাখা হয়।
  • উপদেষ্টা পরিষদ: প্রধান উপদেষ্টার জন্য অনধিক ১০ জন উপদেষ্টা নিয়োগ দেওয়া হবে, যারা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন না।
  • মেয়াদ: এই সরকার কেবল দৈনন্দিন রুটিন দায়িত্ব পালন করবে এবং নতুন সংসদ গঠনের পর নতুন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার সাথে সাথেই এর মেয়াদ শেষ হবে (সাধারণত ৯০ দিন)।

৩. এই সংশোধনীর অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনসমূহ

ত্রয়োদশ সংশোধনীর অধীনে দেশে মোট তিনটি সাধারণ নির্বাচন সফলভাবে এবং উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছিল:

নির্বাচন প্রধান উপদেষ্টা বিজয়ী দল
৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন (১৯৯৬) বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০০১) বিচারপতি লতিফুর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)
৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০০৮) ড. ফখরুদ্দীন আহমদ (সেনা সমর্থিত) বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

৪. বিতর্ক ও বাতিল প্রক্রিয়া

২০০১ সালের নির্বাচনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের বয়সসীমা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নতুন করে টানাপোড়েন শুরু হয়। ২০০৬ সালে রাজনৈতিক সংকটের মুখে দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং সেনা সমর্থিত একটি দীর্ঘমেয়াদী তত্ত্বাবধায়ক সরকার (তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মূল স্পিরিটের বাইরে গিয়ে প্রায় দুই বছর) ক্ষমতায় থাকে।

আইনি চ্যালেঞ্জ: ১৯৯৮ সালে আইনজীবী এম সলিমউল্লাহসহ কয়েকজন এই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন। ২০০৪ সালে হাইকোর্ট একে বৈধ ঘোষণা করলেও পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা হয়।

অবশেষে ২০১১ সালের ১০ মে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ (তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ) বহুল আলোচিত এক রায়ে ত্রয়োদশ সংশোধনীকে অবৈধ ও সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করে। রায়ে বলা হয়, গণতন্ত্র ও জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার ব্যবস্থাপনাই সংবিধানের মূল ভিত্তি, তাই অনির্বাচিত কোনো সরকারের বিধান সংবিধানে টিকতে পারে না।


৫. পঞ্চদশ সংশোধনী ও বর্তমান অবস্থা

সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পর ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে 'পঞ্চদশ সংশোধনী' পাস করা হয়। এর মাধ্যমে সংবিধানে থাকা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটি চূড়ান্তভাবে বিলুপ্ত করা হয় এবং পুনরায় দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা ফিরে আসে।

বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই ত্রয়োদশ সংশোধনী এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা না-আনা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা বিতর্ক ও রাজনৈতিক কর্মসূচি চলমান রয়েছে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url