চতুর্দশ সংশোধনী সম্পর্কে লিখ

 

বাংলাদেশের সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনী: প্রেক্ষাপট ও মূল প্রভাব

বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং রাজনৈতিকভাবে আলোচিত অধ্যায় হলো চতুর্দশ সংশোধনী (14th Amendment)। ২০০৪ সালে পাস হওয়া এই সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা বৃদ্ধি করা হয়, যা পরবর্তীতে দেশের সামগ্রিক রাজনীতি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল।


১. পটভূমি ও পাস হওয়ার প্রেক্ষাপট

২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় ঐক্যজোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। ২০০৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে তৎকালীন সরকার সংবিধানে বেশ কিছু প্রশাসনিক ও কাঠামোগত পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নেয়।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালের ১৬ মে তৎকালীন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ সংসদে চতুর্দশ সংশোধনী বিলটি উত্থাপন করেন। ওই বছরের ১৬ মে জাতীয় সংসদে বিলটি পাস হয় এবং ১৭ মে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের সম্মতিক্রমে এটি আইন হিসেবে কার্যকর হয়।


২. মূল বিষয়বস্তু ও প্রধান পরিবর্তনসমূহ

চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধানে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

  • বিচারপতিদের বয়সসীমা বৃদ্ধি: সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা ৬৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৬৭ বছর করা হয়। এই পরিবর্তনটিই ছিল এই সংশোধনীর সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত দিক।
  • মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসন বৃদ্ধি: জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা ৩০টি থেকে বাড়িয়ে ৪৫টি করা হয় এবং এই আসনগুলো আগামী ১০ বছরের জন্য নির্ধারণ করা হয় (যা পরবর্তীতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত আসনের অনুপাতে বণ্টনের নিয়ম করা হয়)।
  • পিএসসি ও সিএজি-র বয়সসীমা বৃদ্ধি: সরকারি কর্ম কমিশন (PSC) এর চেয়ারম্যান ও সদস্যদের অবসরের বয়সসীমা ৬২ থেকে বাড়িয়ে ৬৫ বছর এবং মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (CAG) এর অবসরের বয়সসীমা ৬০ থেকে বাড়িয়ে ৬৫ বছর করা হয়।
  • প্রতিকৃতি সংরক্ষণ: দেশের রাষ্ট্রপতির কার্যালয় (বঙ্গভবন), প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং বিদেশের মিশনগুলোতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতিকৃতি (ছবি) প্রদর্শন ও সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়।
  • সংসদ সদস্যদের শপথের সময়সীমা: কোনো কারণে স্পিকারের অনুপস্থিতিতে বা অনিচ্ছায় নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত ব্যক্তি বা প্রধান নির্বাচন কমিশনার যাতে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করাতে পারেন, তার আইনি পথ সুগম করা হয়।

৩. রাজনৈতিক বিতর্ক ও ত্রয়োদশ সংশোধনীর সাথে সংযোগ

চতুর্দশ সংশোধনীর অন্যান্য ধারাগুলো সাধারণ হলেও, বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা ৬৫ থেকে ৬৭ বছর করার বিষয়টি তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়। তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো এর তীব্র বিরোধিতা করে।

মূল বিতর্কের কারণ: ত্রয়োদশ সংশোধনী (তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা) অনুযায়ী, সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার কথা ছিল। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল, তৎকালীন ক্ষমতাসীন জোট নিজেদের অনুগত ও পছন্দের একজনকে (তৎকালীন প্রধান বিচারপতি কে এম হাসান) পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করার উদ্দেশ্যেই সুকৌশলে এই বয়সসীমা দুই বছর বাড়িয়ে দিয়েছিল।

এই একটিমাত্র সংশোধনী ২০০৬ সালের শেষের দিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন অনাস্থা ও সংঘাতের পরিবেশ তৈরি করে। বিচারপতি কে এম হাসান প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানানোর পর রাজনৈতিক অচলাবস্থা চরম আকার ধারণ করে, যার চূড়ান্ত পরিণতিতে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং সেনা সমর্থিত ড. ফখরুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে।


৪. মূল্যায়ন

চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে নারীদের সংরক্ষিত আসন বৃদ্ধি বা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের বয়সসীমা পুনঃনির্ধারণের মতো কিছু ইতিবাচক প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও, বিচার বিভাগকে রাজনীতিকরণের অভিযোগ এই সংশোধনীর মূল উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই সংশোধনীটি একটি বড় টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে বিবেচিত, যা পরোক্ষভাবে দেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতাকে বাধাগ্রস্ত করেছিল এবং দীর্ঘমেয়াদে ওয়ান-ইলেভেন (১/১১) এর মতো রাজনৈতিক সংকটের পথ তৈরি করেছিল।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url