পঞ্চদশ সংশোধনী সম্পর্কে লিখ

 

বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী: একটি রাজনৈতিক ও আইনি বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসে পঞ্চদশ সংশোধনী (15th Amendment) হলো সবচেয়ে দূরগামী ও বিতর্কিত পরিবর্তনগুলোর একটি। ২০১১ সালে পাস হওয়া এই সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক কাঠামোর মূল ভিত্তিগুলোতে আমূল পরিবর্তন আনা হয়, যার প্রভাব আজও দেশের রাজনীতিতে বিদ্যমান।


১. পটভূমি ও পাস হওয়ার প্রেক্ষাপট

২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। এরপর ২০১১ সালের ১০ মে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এক ঐতিহাসিক রায়ে নির্দলীয় তত্ত্বাধায়ক সরকার ব্যবস্থার (ত্রয়োদশ সংশোধনী) বিধানকে অবৈধ ও সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করে।

আদালতের এই রায়ের পর সংবিধান পর্যালোচনার জন্য গঠিত বিশেষ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে তৎকালীন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ ২০১১ সালের ২৫ জুন সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী বিল উত্থাপন করেন। ২০১১ সালের ৩০ জুন তৎকালীন সরকারি দলের বিপুল সমর্থনে বিলটি পাস হয় এবং ৩ জুলাই এতে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান স্বাক্ষর করেন।


২. মূল বিষয়বস্তু ও প্রধান পরিবর্তনসমূহ

পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭২ সালের আদি সংবিধানের বেশ কিছু মৌলিক স্তম্ভ ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি নতুন কিছু ধারা যুক্ত করা হয়। এর প্রধান দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপ: এই সংশোধনীর সবচেয়ে বড় ও আলোচিত পরিবর্তন ছিল ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রবর্তিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বাতিল করা। এর ফলে পুনরায় নির্বাচিত দলীয় সরকারের অধীনেই সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের নিয়ম চালু হয়।
  • ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা: সংবিধানের মূল ৪টি রাষ্ট্রীয় নীতি (জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা) পুনর্বহাল করা হয়। তবে একই সাথে অনুচ্ছেদ ২(ক) অনুযায়ী 'ইসলাম'কে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে রাখা হয় এবং অন্যান্য ধর্মের সমঅধিকার নিশ্চিতের কথা বলা হয়।
  • বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি ও স্বীকৃতি: শেখ মুজিবুর রহমানকে 'জাতির পিতা' হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং দেশের সকল সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে তার প্রতিকৃতি (ছবি) সংরক্ষণ ও প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা হয়।
  • সংবিধানের মৌলিক কাঠামো অপরিবর্তনীয়: নতুন অনুচ্ছেদ ৭(খ) যুক্ত করে বলা হয় যে, সংবিধানের প্রস্তাবনা, মৌলিক অধিকার এবং মূল কাঠামো সম্পর্কিত অনুচ্ছেদসমূহ কখনোই সংশোধন বা পরিবর্তন করা যাবে না।
  • অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীদের শাস্তি: সামরিক অভ্যুত্থান বা অন্য কোনো অবৈধ উপায়ে সংবিধান স্থগিত বা বাতিল করার চেষ্টাকে 'রাষ্ট্রদ্রোহিতা' হিসেবে গণ্য করে সর্বোচ্চ শাস্তির (মৃত্যুদণ্ড) বিধান যুক্ত করা হয় (অনুচ্ছেদ ৭ক)।
  • ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ঘোষণা সংযোজন: সংবিধানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ, ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে দেওয়া স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ১০ই এপ্রিল ১৯৭১-এর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে তফসিল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

৩. পঞ্চদশ সংশোধনীর পক্ষের যুক্তি

তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল ও এর সমর্থকদের মতে, এই সংশোধনী দেশের গণতন্ত্রকে দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষিত করেছে। তাদের প্রধান যুক্তিগুলো ছিল:

  1. সর্বোচ্চ আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা: সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ যেহেতু তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করেছিল, তাই আদালতের রায়কে বাস্তবায়ন করা সংসদের আইনি দায়িত্ব ছিল।
  2. অনির্বাচিত সরকারের অবসান: গণতন্ত্রের মূল কথাই হলো নির্বাচিত প্রতিনিধির শাসন। কোনো অনির্বাচিত ব্যক্তি বা অমিলিত টেকনোক্র্যাট দল ৯০ দিনের জন্য দেশের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে না।
  3. জরুরি অবস্থার পুনরাবৃত্তি রোধ: ২০০৭-২০০৮ সালের 'মঈন ইউ-ফখরুদ্দীন'-এর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর যে দমন-পীড়ন চলেছিল, তার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এই ব্যবস্থা বাতিল করা জরুরি ছিল।

৪. পঞ্চদশ সংশোধনীর বিপক্ষের যুক্তি ও সমালোচনা

বিরোধী রাজনৈতিক দল (বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী) এবং নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশ এই সংশোধনীর তীব্র সমালোচনা করে। তাদের প্রধান আপত্তিগুলো ছিল:

রাজনৈতিক সংকটের সূচনা: সমালোচকদের মতে, দলীয় সরকারের অধীনে বাংলাদেশে কখনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়—এটি প্রমাণিত। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করার মাধ্যমে দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অনাস্থা ও নির্বাচনী সহিংসতা বহুগুণ বেড়ে যায়।
  • একতরফা নির্বাচন: এই সংশোধনীর পর ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ পরবর্তী নির্বাচনগুলো ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়, যেখানে প্রধান বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জন বা সুষ্ঠু পরিবেশ না পাওয়ার অভিযোগ তোলে।
  • সংবিধানের পথ রুদ্ধ করা: সংবিধানের একটি বড় অংশকে 'অপরিবর্তনীয়' (অনুচ্ছেদ ৭খ) ঘোষণা করার মাধ্যমে ভবিষ্যতের সংসদের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের ইচ্ছানুযায়ী সংবিধান পরিবর্তনের গণতান্ত্রিক অধিকারকে খর্ব করা হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।

৫. বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি এক দীর্ঘস্থায়ী মেরুকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিরোধী দলগুলো এখনো নির্দলীয় নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকারের দাবিতে আন্দোলন করে আসছে, অন্যদিকে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল সংবিধানের এই পঞ্চদশ সংশোধনীর কাঠামোকে সমুন্নত রেখে দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে অনড় অবস্থান ধরে রেখেছে। ফলে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে এই সংশোধনীটি এখনো অন্যতম প্রধান অনুঘটক।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url