খাইরুদ্দিন বারবারোসাকে ইউরোপীয়রা কখনোই যুদ্ধে হারাতে পারেননি

 


খাইরুদ্দিন বারবারোসা: ভূমধ্যসাগরের পরাজয়হীন বীর এবং অটোমান নৌ-সাম্রাজ্যের ইতিহাস

১৬শ শতকে ভূমধ্যসাগরে যার নামটি পুরো ইউরোপীয় নৌবাহিনী এবং খ্রিস্টান পরাশক্তিগুলোর বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিত, তিনি হলেন খাইরুদ্দিন বারবারোসা (Khairuddin Barbarossa)। তৎকালীন স্পেন, পোপের রাজ্য, পর্তুগাল, ভেনিস এবং জেনোভার মতো অজেয় ইউরোপীয় নৌবহরগুলো একত্রিত হয়েও বারবারোসাকে যুদ্ধে পরাজিত করতে পারেনি। অটোমান সাম্রাজ্যের এই কিংবদন্তি নৌ-সেনাপতি বা 'কাপ্তান-ই দরিয়া' তার সমগ্র জীবনে ভূমধ্যসাগরে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন।

‎ ‎
‎ ‎

১. প্রারম্ভিক জীবন এবং 'বারবারোসা' নামের উৎপত্তি

খাইরুদ্দিন বারবারোসার প্রকৃত নাম ছিল খিজির ইবনে ইয়াকুব। ১৪৭৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে গ্রিসের লেসবস দ্বীপে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ইয়াকুব আগা ছিলেন একজন অটোমান সৈনিক এবং মাতা ক্যাটারিনা ছিলেন গ্রীক খ্রিস্টান পরিবারের সন্তান।

খিজির এবং তার জ্যেষ্ঠ ভাই 'অরুজ' (Oruç) তরুণ বয়সে সাগরে ব্যবসা ও পরবর্তীতে জলদস্যু বিরোধী লড়াইয়ে নামেন। অরুজ তার লাল দাড়ি (Red Beard)-র জন্য ইউরোপীয়দের কাছে 'বারবারোসা' (Barbarossa) নামে পরিচিত হন। উত্তর আফ্রিকায় স্প্যানিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অরুজ শাহাদাত বরণ করলে, অটোমান সুলতান দ্বিতীয় সেলিম খিজিরকে 'খাইরুদ্দিন' (ইসলামের মঙ্গল) উপাধিতে ভূষিত করেন এবং তার ভাইয়ের স্মরণে তিনিও 'বারবারোসা' নামে পরিচিতি লাভ করেন।

‎ ‎
‎ ‎

২. আলজিয়ার্স বিজয় এবং অটোমান খিলাফতে যোগদান

১৫১৮ সালে ভাইয়ের মৃত্যুর পর খাইরুদ্দিন আলজিয়ার্সের (বর্তমান আলজেরিয়া) শাসনভার গ্রহণ করেন। চারদিক থেকে স্প্যানিশ বাহিনীর আক্রমণের মুখে তিনি উত্তর আফ্রিকায় মুসলিমদের ভিত্তি শক্তিশালী করতে অটোমান খিলাফতের তৎকালীন খলিফা সুলতান সুলেইমান 'দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট'-এর আনুগত্য স্বীকার করেন।

সুলতান সুলেইমান খাইরুদ্দিনের সাহসিকতা ও দূরদর্শিতায় মুগ্ধ হয়ে তাকে উত্তর আফ্রিকার গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেন এবং পরবর্তীতে অটোমান সাম্রাজ্যের পুরো নৌবাহিনীর প্রধান বা 'কাপ্তান-ই দরিয়া' (Kapudan Pasha) বানান।

‎ ‎
‎ ‎

৩. প্রাক্টিজা-র ঐতিহাসিক যুদ্ধ (Battle of Preveza - ১৫৩৮): অজেয় প্রতিচ্ছবি

খাইরুদ্দিন বারবারোসার জীবনের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল এবং কালজয়ী যুদ্ধ ছিল ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দের 'প্রাক্টিজা-র যুদ্ধ'। ভূমধ্যসাগরে অটোমানদের একচ্ছত্র আধিপত্য গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য পোপ তৃতীয় পল-এর উদ্যোগে একটি শক্তিশালী খ্রিস্টান 'পবিত্র জোট' (Holy League) গঠিত হয়।

‎ ‎
শক্তির অসম ভারসাম্য: খ্রিস্টান জোটে ছিল স্পেন, ভেনিস, জেনোয়া, পোপের নিজস্ব বাহিনী এবং মাল্টার নাইটদের গঠিত প্রায় ৩০০টি যুদ্ধজাহাজ এবং প্রায় ৬০,০০০ সৈন্য, যার নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন ইউরোপের সেরা নৌ-কমান্ডার অ্যান্ড্রেয়া দোরিয়া (Andrea Doria)। অপরদিকে খাইরুদ্দিন বারবারোসার অধীনে ছিল মাত্র ১২২টি গ্যালি যুদ্ধজাহাজ এবং ২২,০০০ সৈন্য। ‎
‎ ‎

১৫৩৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গ্রিসের প্রাক্টিজা উপকূলে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়। অসম এই যুদ্ধে বারবারোসা তার অসাধারণ যুদ্ধকৌশল, বাতাসের গতিবিধি নিখুঁতভাবে কাজে লাগানো এবং দূরপাল্লার কামানের বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবহারের মাধ্যমে বিশাল ইউরোপীয় নৌবহরকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেন। আন্দ্রেয়া দোরিয়া রণক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। কোনো জাহাজ না হারিয়ে বারবারোসা পুরো ইউরোপীয় জোটকে পরাজিত করে ভূমধ্যসাগরে পরবর্তী ৩৩ বছরের জন্য অটোমান সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র আধিপত্য নিশ্চিত করেন।

‎ ‎
‎ ‎

৪. ইউরোপীয়দের কাছে বারবারোসা কেন পরাজিত করা অসম্ভব ছিল?

গোটা ইউরোপীয় শক্তিগুলো মিলে বহুবার বারবারোসাকে ধ্বংস বা বন্দি করার পরিকল্পনা করেছিল, কিন্তু তিনি প্রতিবারই তাদের কৌশল ব্যর্থ করে দেন। তার অপরাজিত থাকার পেছনে প্রধান কারণগুলো ছিল:

  • অনুপম কৌশলগত জ্ঞান: ভৌগোলিক অবস্থান এবং সমুদ্রের আবহাওয়া ও স্রোত ব্যবহারে তিনি ছিলেন সমসাময়িক যে কারো চেয়ে বহু এগিয়ে।
  • স্প্যানিশ ইনকুইজিশন থেকে মুসলমানদের উদ্ধার: স্পেনে যখন মুসলমানদের ওপর চরম নির্যাতন চালানো হচ্ছিল, তখন বারবারোসা তার নৌবহর নিয়ে হাজার হাজার স্প্যানিশ মুসলিমকে (মরিসকো) উদ্ধার করে নিরাপদে উত্তর আফ্রিকায় পৌঁছে দেন, যা তাকে সাধারণ মানুষের মাঝে অপরাজেয় বীরের মর্যাদা দেয়।
  • ফ্রান্স-অটোমান জোট: বারবারোসার ভয়ে ভীত হয়ে ইউরোপের শক্তি ভারসাম্য রক্ষা করতে ফ্রান্সের রাজা প্রথম ফ্রান্সিস অটোমানদের সাথে জোট করতে বাধ্য হন এবং বারবারোসা নিস (Nice) শহর বিজয়ে ফরাসি বাহিনীকে নেতৃত্ব দেন।
‎ ‎
‎ ‎

৫. এক নজরে খাইরুদ্দিন বারবারোসার গুরুত্বপূর্ণ অভিযানসমূহ

‎ ‎ ‎ ‎ ‎ ‎ ‎ ‎ ‎ ‎ ‎ ‎ ‎ ‎ ‎ ‎ ‎ ‎ ‎ ‎ ‎ ‎ ‎ ‎ ‎ ‎ ‎ ‎ ‎ ‎ ‎
সাল/সময়কালঅভিযানের নাম/স্থানফলাফল ও তাৎপর্য
১৫২৯ খ্রিস্টাব্দআলজিয়ার্সের প্যানন দুর্গ উদ্ধারস্প্যানিশদের দখল থেকে প্যানন দুর্গ উদ্ধার করে উত্তর আফ্রিকায় মুসলিম ঘাঁটি মজবুত করেন।
১৫৩৪ খ্রিস্টাব্দতিউনিসিয়া বিজয়হাফসি রাজবংশকে পরাজিত করে তিউনিস অটোমানদের নিয়ন্ত্রণে আনেন।
১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দপ্রাক্টিজা-র যুদ্ধ (Battle of Preveza)সগ্র ইউরোপীয় সমন্বিত নৌবহরকে পরাজিত করে ইতিহাসের অন্যতম সেরা নৌ-বিজয় অর্জন।
১৫৪৩ খ্রিস্টাব্দনিস (Nice) অবরোধ ও বিজয়ফরাসি বাহিনীর সাথে মিলে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য ও স্পেনকে পরাজিত করে নিস শহর দখল করেন।
‎ ‎
‎ ‎

৬. শেষ জীবন এবং চিরন্তন স্মারক

সমুদ্রের এই বীর তার জীবনের শেষভাগ কাটান ইস্তাম্বুলে। সেখানে তিনি নিজের আত্মজীবনী এবং অটোমান নৌবাহিনীর প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর বেশ কিছু বই রচনায় তদারকি করেন। ১৫৪৬ খ্রিস্টাব্দের ৪ জুলাই প্রায় ৭০ বছর বয়সে ইস্তাম্বুলে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেন খাইরুদ্দিন বারবারোসা।

ইস্তাম্বুলের বেসিকতাসে (Beşiktaş) সাগরের একেবারেই কাছে তাকে দাফন করা হয়। আজও তুরস্কের নৌবাহিনীর জাহাজগুলো সমুদ্র অভিযানে বের হওয়ার আগে ঐতিহ্যগতভাবে বারবারোসার সমাধির পাশে স্যালুট প্রদর্শন করে অভিবাদন জানায়।

‎ ‎

উপসংহার

ইউরোপীয়দের হাজারো চেষ্টা, গুপ্তহত্যা এবং সমন্বিত আক্রমণ সত্ত্বেও খাইরুদ্দিন বারবারোসাকে কোনো যুদ্ধে হারানো সম্ভব হয়নি। তিনি কেবল একজন দক্ষ নৌ-অধিনায়কই ছিলেন না, বরং ভূমধ্যসাগরে অটোমান খিলাফতের ক্ষমতাকে চূড়ায় নিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারিগর হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url